ত্রিপুরার ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে যখন বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য সিংহাসনে বসেন (১৯২৩), তখন ভারতের আকাশ স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাপে লাল হয়ে আছে। আগরতলার রাজপ্রাসাদ থেকে মনে হতে পারত মাণিক্য রাজবংশ স্বাধীন, কিন্তু বাস্তব ছিল তার উল্টো। প্রতিটি রাজাজ্ঞা, প্রতিটি প্রশাসনিক ফাইল আর এমনকি মহারাজার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক সিদ্ধান্তও নিয়ন্ত্রিত হতো কলকাতার ‘পলিটিক্যাল এজেন্ট’-এর মাধ্যমে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের সেই তথাকথিত ‘আধুনিকীকরণ’-এর পেছনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা এবং ব্রিটিশদের শোষণের সেই অন্ধকার অধ্যায়গুলো বিশ্লেষণ করব।

​১. ব্রিটিশদের ‘প্যারামাউন্টসি’ ও সার্বভৌমত্বের অপমৃত্যু

​১৮শ শতক থেকেই ব্রিটিশরা ত্রিপুরার রাজাদের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করেছিল। বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য যখন ১৯২৩ সালে রাজ্যাভিষেক করেন, তখন তাঁকে যে ‘সনদ’ দেওয়া হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল যে তিনি ব্রিটিশ সম্রাট বা সম্রাজ্ঞীর প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য।

​ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, বীর বিক্রম কিশোরের শাসনব্যবস্থা আসলে ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার একটি ‘মডেল স্টেট’ তৈরির পরীক্ষা। ব্রিটিশরা সরাসরি ত্রিপুরা শাসন না করলেও মহারাজার মাধ্যমে এমন এক প্রশাসন গড়ে তুলেছিল যা মূলত ব্রিটিশদের রাজস্ব আদায় আর সাম্রাজ্যিক নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করত। মহারাজা যে ‘কাউন্সিল অফ মিনিস্টারস’ গঠন করেছিলেন, তার মূল আমলারা ছিলেন ব্রিটিশদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। ফলে রাজার নিজস্ব ইচ্ছা অনেক সময়ই ব্রিটিশ স্বার্থের কাছে হার মানত।

​২. ১৯৩১-এর ট্রাইবাল রিজার্ভ: সুরক্ষার আড়ালে রাজনৈতিক দেওয়াল

​বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের সবথেকে প্রশংসিত কাজ ধরা হয় ‘ট্রাইবাল রিজার্ভ’ বা উপজাতি এলাকা সংরক্ষণকে। ১৯৩১ এবং পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে তিনি প্রায় ১১০ বর্গমাইল এলাকা সংরক্ষিত ঘোষণা করেন। সরকারি বয়ানে একে বলা হয় ‘উপজাতিদের জমি রক্ষার কবচ’। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর রাজনৈতিক চাল (Strategic Isolation)।

​তৎকালীন সময়ে অবিভক্ত বাংলার বিপ্লবীরা (যেমন—যুগান্তর বা অনুশীলন সমিতি) ব্রিটিশদের চোখে বিষ হয়ে উঠেছিল। এই বিপ্লবীদের অনেকেই ত্রিপুরার সমতলে বসবাসকারী বাঙালিদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। ব্রিটিশরা আতঙ্কিত ছিল যে, বাংলার এই স্বাধীনতার আগুন যদি ত্রিপুরার দুর্গম পাহাড়ের উপজাতিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে ব্রিটিশদের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

​তাই রাজাকে ব্যবহার করে উপজাতিদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হলো। এর ফলে উপজাতিরা যেমন আধুনিক শিক্ষা আর রাজনৈতিক চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, তেমনি রাজার অনুগত একটি স্থায়ী ‘ভোট ব্যাংক’ বা সমর্থন গোষ্ঠী তৈরি হলো। এটি ছিল ব্রিটিশদের সেই পুরোনো ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসির একটি সূক্ষ্ম প্রয়োগ। উপজাতিরা জমি রক্ষা পেলেও, তারা আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলনের মূলস্রোত থেকে দশকের পর দশক পিছিয়ে গেল।

​৩. রতনমণি রিয়াংয়ের বিদ্রোহ (১৯৪২-৪৩): প্রশাসনের অন্ধকার পিঠ

​বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের শাসনকালকে যারা ‘স্বর্ণযুগ’ বলেন, তারা প্রায়শই রতনমণি রিয়াংয়ের বিদ্রোহের কথা চেপে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা অসহ্য হয়ে উঠেছিল এবং জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হচ্ছিল, তখন রিয়াং উপজাতির মানুষেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রতনমণি রিয়াংয়ের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ ছিল মূলত রাজকীয় প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।

​কিন্তু বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের প্রশাসন সেই বিদ্রোহ অত্যন্ত নৃশংসভাবে দমন করেছিল। কয়েকশ মানুষকে বন্দি করা হয়, অনেকের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত রতনমণি রিয়াং পুলিশের হেফাজতে মারা যান। একজন ‘জনদরদী’ রাজার আমলে নিজ প্রজাদের ওপর এই ধরণের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ইতিহাসের পাতায় এক গভীর কলঙ্ক। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজার প্রশাসন সাধারণ মানুষের চাহিদার চেয়ে ব্রিটিশদের যুদ্ধকালীন বাধ্যবাধকতা পূরণ করতেই বেশি ব্যস্ত ছিল।

​৪. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: ত্রিপুরার সম্পদ লুণ্ঠনের অধ্যায়

​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) ত্রিপুরা ছিল মিত্রশক্তির একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটি। বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যকে ব্রিটিশরা ‘কর্নেল’ উপাধি দিয়েছিল, কিন্তু এর বিনিময়ে ত্রিপুরাকে দিতে হয়েছিল চড়া মূল্য।

​রাজস্বের অপচয়: ত্রিপুরার কোষাগারের একটি বিশাল অংশ ব্রিটিশ ‘ওয়ার ফান্ড’-এ দান করা হয়েছিল। সাধারণ প্রজাদের ওপর ‘ওয়ার ট্যাক্স’ চাপানো হয়েছিল।

​সম্পদ লুণ্ঠন: ত্রিপুরার বনাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে সেগুন ও অন্যান্য কাঠ কেটে নেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশদের যুদ্ধের প্রয়োজনে, যার ফলে ত্রিপুরার পরিবেশগত অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

​দুর্ভিক্ষের ছায়া: ১৯৪৩-এর বাংলার মন্বন্তরের সময় ত্রিপুরার কৃষিজাত পণ্য ব্রিটিশ সেনাদের জন্য মজুত করা হয়েছিল, যার ফলে ত্রিপুরার অভ্যন্তরেও খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। রাজার প্রশাসন এই খাদ্যসংকট মোকাবিলা করার চেয়ে ব্রিটিশ সেনাদের রসদ যোগান দিতেই বেশি তৎপর ছিল।

​৫. প্রশাসনিক সংস্কার না কি ঔপনিবেশিক অনুকরণ?

​বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যকে বলা হয় ‘আধুনিক ত্রিপুরার স্থপতি’। তিনি আগরতলার মাস্টার প্ল্যান করেছিলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের কথা বলেছিলেন। কিন্তু গভীরে দেখলে বোঝা যায়, এই সংস্কারগুলো ছিল মূলত শহরের ‘এলিট’ বা রাজন্য বর্গের স্বার্থে। রাজপ্রাসাদ উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হলেও পাহাড়ের অভ্যন্তরে শিক্ষার আলো বা চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা পৌঁছায়নি।

​মহারাজা ১৯৩৯ সালে যে ‘পঞ্চায়েত আইন’ বা ‘গ্রামমণ্ডলী’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, তা আসলে ছিল ব্রিটিশদের ‘লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট’ পলিসির অনুকরণ। এটি জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য নয়, বরং স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে রাজার নিয়ন্ত্রণ সুদূর গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার একটি হাতিয়ার ছিল। রাজার আমলারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রজাদের সাথে সংযোগহীন হয়ে পড়েছিলেন, যা পরবর্তীতে মাণিক্য রাজবংশের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

​৬. টিপিএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

​টিপিএসসি (TPSC) পরীক্ষায় যখন বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য সম্পর্কে প্রশ্ন আসবে, তখন পরীক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে যে তাঁর অবদানগুলোকে অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেগুলোকে রাজকীয় দাক্ষিণ্য বলে ভাবলে ভুল হবে।

​শিক্ষা: তিনি কলেজের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন ঠিকই (যা এখন এমবিবি কলেজ), কিন্তু সেই শিক্ষা ছিল মূলত রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তদের জন্য।

​জমিদারি: চকল্লা রোশনাবাদ (ত্রিপুরার জমিদারি যা বর্তমানে বাংলাদেশে) থেকে আসা রাজস্বের সিংহভাগই রাজাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন আর বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় হতো, প্রজাদের উন্নয়নে তার খুব কমই খরচ হতো।

​৭. উপসংহার: এক বন্দি পাখির রাজত্ব

​বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য একজন অযোগ্য রাজা ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন সময়ের শিকার। তিনি ব্রিটিশদের সেই ‘গোল্ডেন কেজ’ বা সোনার খাঁচায় বন্দি ছিলেন, যেখানে ডানা ঝাপটানোর অধিকার থাকলেও ওড়ার স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগে তাঁর অকাল মৃত্যু ত্রিপুরার ভাগ্যকে এক অনিশ্চিত পথে ঠেলে দেয়।

​তাঁর শাসনামল আমাদের শেখায় যে, আধুনিকতা মানে কেবল বড় বড় দালান বা প্রশাসনিক আইন নয়; প্রকৃত আধুনিকতা হলো আমজনতার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য সেই মুক্তি দিতে পারেননি, কারণ তাঁর ক্ষমতার রাশ ছিল ব্রিটিশ পলিটিক্যাল এজেন্টের হাতে।