যক্ষ্মার রক্ত আর গ্রিক পুরাণের অমরত্ব: ‘Endymion’ ও কিটসের লড়াই
প্রেক্ষাপট ও মিথের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
আঠারোশ আঠারো সাল। লন্ডনের একটি ছোট ঘরে বসে এক যুবক রক্তমাখা রুমালের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি জানেন তাঁর ফুসফুস জবাব দিচ্ছে। তিনি ডাক্তার, তাই নিজের মৃত্যুপরোয়ানা তিনি নিজেই পড়তে পারছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকার মাঝেই তিনি লিখছেন—"A thing of beauty is a joy for ever." এই যুবক আর কেউ নন, জন কিটস। তাঁর মহাকাব্যিক কবিতা 'Endymion'-এর শুরুটা ছিল এমনই এক মরণজয়ী ঘোষণা।
১. সমালোচকদের বিষ আর কিটসের জেদ
কিটস যখন এই কবিতাটি লেখা শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র একুশ। সমকালীন সমালোচকরা তাঁকে ‘Cockney School of Poetry’-র একজন নগণ্য কবি বলে উপহাস করত। তাদের মতে, কিটস ছিলেন একজন নিচু স্তরের কবি যিনি কেবল অলীক কল্পনা করেন। কিন্তু কিটস দমে যাননি। তিনি জানতেন তাঁর সময় কম। তাঁর মা যক্ষ্মায় মারা গেছেন, ভাই টম যক্ষ্মায় কাতরাচ্ছেন। এই ব্যক্তিগত শোক আর সমালোচকদের বিদ্রূপ—সব মিলিয়ে কিটস এক ধরণের নিঃসঙ্গতার শিকার হয়েছিলেন। 'Endymion' ছিল তাঁর সেই নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তির এক সুড়ঙ্গ পথ।
২. এন্ডিমিয়ন মিথের গূঢ় রহস্য
মিথ অনুযায়ী, এন্ডিমিয়ন ছিলেন ল্যাটমস পাহাড়ের এক সুদর্শন মেষপালক। তাঁর দেবতুল্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আকাশ থেকে নেমে আসেন চাঁদের দেবী সিনথিয়া। দেবী অমর, কিন্তু মরণশীল মানুষের প্রেমে পড়া এক অভিশাপ। এই বিরহ এড়াতে দেবী প্রার্থনা করলেন। দেবরাজ জিউস এন্ডিমিয়নকে এক ‘অনন্ত নিদ্রা’ (Eternal Sleep) দান করলেন। তিনি ল্যাটমস পাহাড়ের এক গুহায় চিরকাল ঘুমিয়ে রইলেন—যাতে তাঁর সৌন্দর্য কখনও নষ্ট না হয়।
কিটস এই মিথটিকে তাঁর দর্শনের মূল খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এন্ডিমিয়নের এই ‘চিরনিদ্রা’ আসলে শিল্পের সেই অমর রূপ, যা সময়ের গণ্ডি মানে না। কিটস জানতেন তাঁর শরীর হয়তো একদিন ধুলোয় মিশবে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি বা ‘Thing of Beauty’ কখনও শূন্যতায় মিশবে না। আজ আমরা দুই শতাব্দী পর দাঁড়িয়ে তাঁর কথা পড়ছি—এটাই কিটসের জয়।
৩. মৃত্যুভয় বনাম চিরন্তন সৌন্দর্য
"সৌন্দর্য কি কেবল চোখের পলকে? না কি তা আত্মার এক গভীরে প্রোথিত শক্তি?"
অধিকাংশ সমালোচক মনে করেন, কিটসের এই সৌন্দর্য-তত্ত্ব আসলে এক ধরণের ধর্ম বা ‘Religiosity of Beauty’। যেখানে ঈশ্বর নয়, বরং শিল্পের নিখুঁত রূপই মানুষের শেষ আশ্রয়। কিটস তাঁর কবিতায় ল্যাটমস পাহাড়ের সেই গুহার কথা বলেছেন যা আসলে আমাদের অবচেতন মন, যেখানে আমরা সব সুন্দর স্মৃতি আর অনুভূতিগুলোকে অমর করে বাঁচিয়ে রাখি।
কিটস একজন দক্ষ চিকিৎসকের মতো মানুষের আত্মার ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করেছেন এবং সেই ক্ষতে সৌন্দর্যের প্রলেপ লাগানোর উপায় বাতলেছেন। এতক্ষণ আমরা জেনেছি সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আর এন্ডিমিয়ন মিথের কথা। এখন আমরা কবিতার গভীরে প্রবেশ করব, যেখানে কিটস সৌন্দর্যের এক অবিনশ্বর সংজ্ঞা তৈরি করেছেন।
Its loveliness increases; it will never
Pass into nothingness;"
১. ‘Joy’ কেন নিছক আনন্দ নয়?
লক্ষ্য করুন, কিটস এখানে ‘Joy’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ‘Pleasure’ নয়। কেন? কারণ ‘Pleasure’ বা আমোদ হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ‘Joy’ হলো আধ্যাত্মিক এবং চিরন্তন। সমালোচক আই. এ. রিচার্ডস কিটসের এই লাইনের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, সৌন্দর্য যখন একবার মনে গেঁথে যায়, তখন তা সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে।
২. শূন্যতা বনাম কিটসের জেদ
"Nothingness" শব্দটি কিটসের কবিতায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন এই লাইনটি লিখছেন, তাঁর সামনে তখন যক্ষ্মায় আক্রান্ত ভাইয়ের মৃত্যুঘণ্টা বাজছে। কিটস জানতেন শরীর পচনশীল, কিন্তু শিল্পের ছোঁয়ায় যা সুন্দর হয়ে উঠেছে, তা কখনও শূন্যতায় বিলীন হতে পারে না। এটি মৃত্যুকে দেওয়া এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
A bower quiet for us, and a sleep
Full of sweet dreams..."
৩. সৌন্দর্যের থেরাপি ও শান্ত নিঃশ্বাস
এখানে কিটসের সেই ডাক্তার সত্তাটি বেরিয়ে এসেছে। যক্ষ্মারোগীর প্রধান কষ্ট হলো নিঃশ্বাস নিতে না পারা। কিটস বলছেন, সৌন্দর্য আমাদের এমন এক মানসিক প্রশান্তি দেয় যা আমাদের রক্তচাপ কমায় এবং নিঃশ্বাসকে শান্ত (Quiet breathing) করে তোলে। এটি নিছক অলঙ্কার নয়, এটি একটি শারীরিক সত্য।
কিটস একজন দক্ষ চিকিৎসকের মতো মানুষের আত্মার ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করেছেন এবং সেই ক্ষতে সৌন্দর্যের প্রলেপ লাগানোর উপায় বাতলেছেন। প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আর এন্ডিমিয়ন মিথের কথা। আজ আমরা কবিতার গভীরে প্রবেশ করব, যেখানে কিটস সৌন্দর্যের এক অবিনশ্বর সংজ্ঞা তৈরি করেছেন।
Its loveliness increases; it will never
Pass into nothingness;"
১. ‘Joy’ কেন নিছক আনন্দ নয়?
লক্ষ্য করুন, কিটস এখানে ‘Joy’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ‘Pleasure’ নয়। কেন? কারণ ‘Pleasure’ বা আমোদ হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ‘Joy’ হলো আধ্যাত্মিক এবং চিরন্তন। সমালোচক আই. এ. রিচার্ডস কিটসের এই লাইনের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, সৌন্দর্য যখন একবার মনে গেঁথে যায়, তখন তা সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে।
২. শূন্যতা বনাম কিটসের জেদ
"Nothingness" শব্দটি কিটসের কবিতায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন এই লাইনটি লিখছেন, তাঁর সামনে তখন যক্ষ্মায় আক্রান্ত ভাইয়ের মৃত্যুঘণ্টা বাজছে। কিটস জানতেন শরীর পচনশীল, কিন্তু শিল্পের ছোঁয়ায় যা সুন্দর হয়ে উঠেছে, তা কখনও শূন্যতায় বিলীন হতে পারে না। এটি মৃত্যুকে দেওয়া এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
A bower quiet for us, and a sleep
Full of sweet dreams..."
৩. সৌন্দর্যের থেরাপি ও শান্ত নিঃশ্বাস
এখানে কিটসের সেই ডাক্তার সত্তাটি বেরিয়ে এসেছে। যক্ষ্মারোগীর প্রধান কষ্ট হলো নিঃশ্বাস নিতে না পারা। কিটস বলছেন, সৌন্দর্য আমাদের এমন এক মানসিক প্রশান্তি দেয় যা আমাদের রক্তচাপ কমায় এবং নিঃশ্বাসকে শান্ত (Quiet breathing) করে তোলে। এটি নিছক অলঙ্কার নয়, এটি একটি শারীরিক সত্য।
আগের দুটি পর্বে আমরা সুন্দরের সংজ্ঞা এবং কিটসের ব্যক্তিগত লড়াই নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমরা এই কবিতার সেই অংশে প্রবেশ করব যেখানে কিটস জীবনের অন্ধকার দিকগুলোকে কোনো লুকোছাপা ছাড়াই স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি কেবল সুন্দরের স্তুতি গাননি, বরং কেন আমাদের জীবনে সুন্দরের প্রয়োজন—সেই রূঢ় বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
কিটস এখানে অত্যন্ত সাহসের সাথে আধুনিক সমাজের একটি বড় ক্ষত তুলে ধরেছেন—‘Inhuman dearth of noble natures’। অর্থাৎ মহৎ হৃদয়ের আকাল। তিনি মানছেন যে পৃথিবীতে হতাশা আছে, স্বার্থপরতা আছে। সমালোচক এফ. আর. লিভিস কিটসের এই অংশটিকে বাস্তববাদের এক অনন্য নিদর্শন বলেছেন। কিটসের দর্শন হলো—এই অন্ধকারের বিপরীতে দাঁড়িয়েই আলোর মহিমা বোঝা সম্ভব।
We have imagined for the mighty dead;
All lovely tales that we have heard or read:"
৪. মহান যোদ্ধাদের স্মৃতি ও বীরত্বগাঁথা
সাধারণ মানুষ সৌন্দর্য বলতে কেবল ফুল বা নদী বোঝে। কিন্তু কিটস বলছেন, যারা দেশের জন্য বা সত্যের জন্য প্রাণ দিয়েছেন (Mighty Dead), তাঁদের সেই আত্মত্যাগের কাহিনির মধ্যেও এক ধরণের ‘Grandeur’ বা মহিমা লুকিয়ে আছে। বীর শহিদদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং মহৎ কাজ মানুষের নামকে অমর করে রাখে।
৫. স্বর্গের অমৃতধারা
কবিতার শেষ দুই লাইনে কিটস সৌন্দর্যকে তুলনা করেছেন একটি ‘Endless Fountain’ বা অনন্ত ঝর্ণার সাথে। এটি এক ‘Immortal drink’ বা অমৃত। কিটস মনে করতেন, প্রকৃতি আর মহৎ সাহিত্য হলো সেই মাধ্যম যার সাহায্যে ভগবান স্বয়ং মানুষের কাছে তাঁর করুণা পৌঁছে দেন।
জন কিটস আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো সেই সৌন্দর্য মহাকাশের নক্ষত্রের মতো আমাদের অন্ধকারকে শাসন করছে। আজকের এই যান্ত্রিক যুগে কিটসের এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শান্তি কোনো ব্যাঙ্কে থাকে না, শান্তি থাকে এক চিলতে রোদ, এক ফালি বাগান কিংবা মহৎ কোনো আদর্শের মধ্যে।