বাংলার আকাশ-বাতাস আজ এক অদ্ভুত বানানের অরাজকতায় আচ্ছন্ন। আপনি যদি কলকাতার রাস্তা দিয়ে হাঁটেন কিংবা ঢাকা শহরের অলিগলিতে ঘোরেন, তবে দেখবেন একই 'বাড়ি' কোথাও 'বাড়ি' হয়ে হ্রস্ব-ই কারে হাসছে, আবার কোথাও 'বাড়ী' হয়ে দীর্ঘ-ঈ কারের গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই যে হ্রস্ব আর দীর্ঘের লড়াই, এটা কেবল ব্যাকরণের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই; এটা বাঙালির মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আমরা যারা বাংলা লিখি বা পড়ি, তাদের অবচেতনে বানান নিয়ে এক ধরণের হীনম্মন্যতা কাজ করে। বানান ভুল হওয়া মানেই যেন জাত যাওয়া। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই 'সঠিক' বানানের সংজ্ঞাটা গত এক শতাব্দীতে এতবার বদলেছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তাল মেলানো দায় হয়ে পড়েছে। আজ যা শুদ্ধ, কাল তা অশুদ্ধ। এই যে অস্থিরতা, এর মূলে রয়েছে আমাদের ভাষার বিবর্তন এবং তদ্ভব ও তৎসমের এক আদিম দ্বন্দ্ব।
বাংলা ভাষার আদি পিতা হিসেবে সংস্কৃতকে মানা হয় (যদিও ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এটি বিতর্কিত)। সংস্কৃত বা 'তত্সম' (তার সমান) শব্দগুলো যখন বাংলায় এল, তারা তাদের সাথে করে নিয়ে এল একগাদা কড়া নিয়ম। সংস্কৃত ব্যাকরণে হ্রস্ব-ই এবং দীর্ঘ-ঈ-র উচ্চারণে আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। সেখানে 'ই' ছিল এক মাত্রা, আর 'ঈ' ছিল দুই মাত্রার সময় নিয়ে উচ্চারিত এক গভীর ধ্বনি।
কিন্তু বাঙালি যখন বাংলা বলতে শুরু করল, তার জিভ অত কসরত করতে নারাজ। বাঙালি 'পাখি' বলার সময় হ্রস্ব আর দীর্ঘের কোনো তফাত রাখে না। আমাদের কানে 'গিরি' আর 'তরী'—উভয় ক্ষেত্রেই 'ই' ধ্বনিটি একই দৈর্ঘ্যের। ফলে উচ্চারণে যা নেই, তাকে বানানে ধরে রাখার এই যে আপ্রাণ চেষ্টা, একেই আমি বলি 'তৎসমের ভূত'।
১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবার এই ভূত ঝাড়ানোর চেষ্টা করে। রাজশেখর বসু (পরশুরাম) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্রাকৃত বা তদ্ভব শব্দের ক্ষেত্রে অহেতুক দীর্ঘ-ঈ বা দীর্ঘ-উ টানার কোনো মানে হয় না। তাঁরা নিয়ম করলেন—যা তৎসম নয়, তা হবে হ্রস্ব। অর্থাৎ, 'হাতি', 'পাখি', 'দিঘি'—এরা সব হবে হ্রস্ব-ই কার। কিন্তু সংস্কার কী সহজে যায়? আজও বহু বিদ্বান ব্যক্তি 'বাঙালী' বানানটি দীর্ঘ-ঈ দিয়ে লিখতে পছন্দ করেন, কারণ তাঁদের মনে হয় হ্রস্ব-ই দিলে বাঙালিয়ানার ওজন কমে যায়।
বাঙালি জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক—এই কথাটা বানানের ক্ষেত্রে খাটে না। বিদেশি শব্দের বানানে আমরা চূড়ান্ত লেজেগোবরে করে রেখেছি। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি শব্দে দীর্ঘ-ঈ (ী) বা দীর্ঘ-উ (ূ) ব্যবহার করা যাবে না। নিয়মটা শুনতে খুব সহজ। তাই 'স্টেশন', 'পুলিশ', 'ইঞ্জিনিয়ার' এখন হ্রস্ব-ই দিয়েই লেখা হয়।
কিন্তু গোলমাল পাকালো 'ইরাক', 'ইরান' বা 'আইসক্রিম' নিয়ে। একদল পণ্ডিত বলছেন বিদেশি শব্দে 'ই' কার হবে, অন্যদল বলছেন না, উচ্চারণের আভিজাত্য রক্ষায় কিছু ছাড় দেওয়া হোক। আবার দেখুন 'আরবি' বা 'ফারসি' বানানটি। যেহেতু এগুলো ভাষার নাম, তাই বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী এদের হ্রস্ব-ই হওয়া উচিত। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘ-ঈ না দিলে ঠিক 'মৌলভি' মেজাজটা আসে না। এই যে বানানের মাধ্যমে অর্থের বা আভিজাত্যের ওজন বাড়ানো—এটি বাংলা বানানের এক অদ্ভুত সাইকোলজি।
বাংলা বানানের সবথেকে ট্র্যাজিক চরিত্র হলো 'চন্দ্রবিন্দু' (ঁ)। আধুনিক কিবোর্ডের যুগে টাইপ করার অলসতায় আমরা চন্দ্রবিন্দুকে প্রায় নির্বাসনে পাঠিয়েছি। অথচ এই বিন্দুটির গুরুত্ব অপরিসীম। চন্দ্রবিন্দু কেবল একটি নাসিক্য ধ্বনি নয়, এটি বাংলায় সম্মানের প্রতীকও বটে।
আমরা যখন বলি 'তিনি' এবং 'তাঁকে', তখন সেই চন্দ্রবিন্দুটিই নির্ধারণ করে দেয় আমরা কোনো শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কথা বলছি নাকি সমবয়সী কারও। মজার ব্যাপার হলো, সংস্কৃত শব্দে যেখানে 'ন' বা 'ম' লুপ্ত হয়েছে, সেখানে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে চন্দ্রবিন্দু আসে (যেমন: দন্ত > দাঁত, সন্ধ্যা > সাঁঝ)। কিন্তু বর্তমানে 'পঁচিশ' লিখতে গিয়ে মানুষ 'পচিশ' লিখে ফেলছে। অথচ 'পচিশ' শুনলে মনে হয় কোনো কিছু পচে যাওয়ার গন্ধ আসছে! চন্দ্রবিন্দুর এই হারিয়ে যাওয়া আসলে আমাদের শ্রুতি এবং উচ্চারণের অবক্ষয়েরই প্রতিফলন।
বাংলা যুক্তাক্ষর বা 'Ligatures' হলো বিদেশি পাঠকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। 'ক্ষ' দেখে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে 'ক' আর 'ষ' লুকিয়ে আছে। আবার 'হ্ম' (ব্রহ্ম) দেখে কে বলবে এর উচ্চারণ হবে 'ম্ম'?
আধুনিক সংস্কারে অনেক পণ্ডিত পরামর্শ দিচ্ছেন যুক্তাক্ষর ভেঙে ফেলার জন্য। যেমন 'অঙ্ক' না লিখে 'অংক' বা 'শঙ্খ' না লিখে 'শংখ'। যুক্তিটা হলো কম্পিউটারে টাইপিং সহজ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভাষার সৌন্দর্য কি কেবল টাইপিং-এর সুবিধার ওপর নির্ভর করবে? 'অঙ্ক' বানানটির যে দৃশ্যগত গাম্ভীর্য, তা 'অংক'-তে নেই। যুক্তাক্ষর ভাঙা মানে হলো ভাষার হাড়গোড় ভেঙে তাকে লুলিয়ে দেওয়া। কিন্তু সময় বদলেছে, আজকের প্রজন্ম তথ্যের গতি চায়, নান্দনিকতা নয়। তাই 'ক-এ ত-এ' (ক্ত) আজ টাইপিং-এর চোটে 'ক' আর 'ত' আলাদা হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ণ-ত্ব বিধান আর ষ-ত্ব বিধান—এই দুই বিভীষিকা আমাদের ছাত্রজীবনের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। কেন 'ঋ, র, ষ'-এর পরে 'ণ' হবে, আর কেন 'ত-বর্গ'-এর পরে হবে না—এই নিয়মগুলো মুখস্থ করতে গিয়ে অনেকেই বাংলা পড়ার আনন্দটাই হারিয়ে ফেলেন।
কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখুন, আমরা যখন 'কর্ন' (Corn) বা 'গভর্নর' লিখি, সেখানে কি 'ণ' দেব নাকি 'ন'? নিয়ম বলছে বিদেশি শব্দে 'ণ' হবে না। কিন্তু উচ্চারণে তো আমরা সেখানে মূর্ধন্যর ছোঁয়া পাই। আবার 'র' এর পর তো নিয়ম অনুযায়ী 'ণ' হওয়ার কথা। এই যে নিয়মের ভেতরে নিয়ম, আর তার ভেতরে ব্যতিক্রম—এটাই বাংলা বানানকে সাধারণের কাছে 'এলিটিস্ট' বা অভিজাতদের সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছে।
বানানের বিবর্তন: প্রমথ চৌধুরী থেকে ফেসবুক জেনারেশন
বাংলা বানানের বিবর্তনকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়।
প্রথম পর্ব: বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের আমল, যেখানে সংস্কৃত ব্যাকরণই ছিল শেষ কথা।
দ্বিতীয় পর্ব: প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথের আমল, যেখানে চলিত ভাষার জয়গান গাওয়া হলো এবং বানানে কিছুটা শিথিলতা এল।
তৃতীয় পর্ব: বর্তমানের 'ইউনিকোড' বা ফেসবুক যুগ।
এখন বানান কোনো নিয়ম মানে না। এখন বানান তৈরি হয় কিবোর্ডের সাজেশনের ওপর ভিত্তি করে। অটো-কারেক্ট অপশন অনেক সময় 'বরণ'কে 'বরন' করে দিচ্ছে, আর আমরাও তা মুখ বুজে মেনে নিচ্ছি। এই যে প্রযুক্তিনির্ভর বানান চর্চা, এটা ভাষার ব্যাকরণগত ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। তবে এর একটা ইতিবাচক দিকও আছে—ভাষা এখন অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। আগে বানান ভুল করলে সমাজ 'অশিক্ষিত' বলত, এখন মানুষ বড়জোর 'টাইপো' বলে এড়িয়ে যায়।
শেষে এসে একটা কথাই বলতে হয়—বানান কি কেবল কতগুলো বর্ণের সমষ্টি? না। বানান হলো একটি জাতির রুচি ও ঐতিহ্যের স্মারক। আপনি যখন 'মা' লিখছেন, তখন সেই অ-কারান্ত ধ্বনিটির পেছনে হাজার বছরের আবেগ জড়িয়ে আছে। আপনি যখন 'দুঃখ' লিখতে গিয়ে বিসর্গটি বাদ দিচ্ছেন, তখন সেই দুঃখের গভীরতাটাই যেন কমে যাচ্ছে।
বাংলা বানান সংস্কার দরকার, কিন্তু তা যেন ভাষার আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে না হয়। রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলেছিলেন, "বানান নিয়ে মারামারি করাটা পন্ডিতদের কাজ, কিন্তু ভাষা নিয়ে বাঁচাটা মানুষের কাজ।" আমরা যেন বানানের জঙ্গলে ভাষাটাকে হারিয়ে না ফেলি। হ্রস্ব হোক বা দীর্ঘ, ই-কার হোক বা ঈ-কার—সবকিছুর উর্ধ্বে যেন অক্ষরের প্রতি আমাদের মমতা বেঁচে থাকে।
আপনি যখন পরের বার কলম ধরবেন বা কিবোর্ডে আঙুল ছোঁয়াবেন, একবার ভাববেন—আপনি কি কেবল একটি শব্দ লিখছেন, নাকি হাজার বছরের এক বিশাল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছেন? বানানের নির্ভুলতার চেয়েও জরুরি হলো মনের শুদ্ধতা। তবে হ্যাঁ, 'আপন' লিখতে গিয়ে যেন 'আঁপন' না হয়ে যায়—সেই সচেতনতাটুকু থাকলেই বাংলা বানান অন্তত তার শ্রী হারাবে না।