প্রাককথন: এক অপবাদের জবাব
বাঙালির ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত কী বুঝি? একদল চশমা পরা, দুর্বল স্বাস্থ্যের, ‘বড় তর্কের ছোটো ওস্তাদ’ কেরানি বা বুদ্ধিজীবী? নাকি ব্রিটিশের দেওয়া সেই কুখ্যাত তকমা—"Non-martial Race" বা অ-লড়াকু জাতি? উনিশ শতকের শেষভাগে যখন লর্ড মেকলে এবং তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা বাঙালিকে ‘ভীরু’, ‘কাপুরুষ’ এবং ‘মেয়েছেলে’ বলে উপহাস করছেন, ঠিক সেই সময়টিতেই কলকাতার বুকে এবং মফস্বলের ধুলোমাখা মাটিতে নিঃশব্দে এক অন্য ইতিহাস লেখা হচ্ছিল। সেই ইতিহাসের কালি কোনো দোয়াতের কালি নয়, তা ছিল ঘাম আর রক্ত।
আজকের এই দীর্ঘ আখ্যানে আমরা সেই তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ বাঙালির ড্রইংরুমের বাইরে উঁকি দেব। আমরা প্রবেশ করব এমন এক জগতে, যেখানে বাঘের গর্জন আর চাবুকের শপাং শব্দে বাঙালির হৃতগৌরব ফিরে আসছিল। আমরা কথা বলব ‘সার্কাস’ নিয়ে। না, এ কোনো জোকারের ভাঁড়ামো নয়। পরাধীন ভারতে বাঙালির সার্কাস ছিল বারুদের মতো—যা ফেটে পড়ার অপেক্ষায় ছিল। শরীরচর্চার আড়ালে এটি ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে বাদামি চামড়ার বাঙালি প্রমাণ করে দিচ্ছিল—সাহসে, শক্তিতে এবং কৌশলে তারা সাদা চামড়ার প্রভুদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং এককাঠি উপরে।
আসুন, বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে তুলে আনি সেইসব নায়কদের, যাদের নাম আজ আমাদের পাঠ্যবইয়ের পাদটীকাতেও জায়গা পায় না।
প্রথম পর্ব: প্রিয়নাথ বসু—যিনি স্বপ্ন দেখাতেন না, স্বপ্ন গড়তেন
বাঙালির সার্কাসের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন প্রিয়নাথ বসু। কিন্তু তাঁকে কেবল ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন বাঙালির ‘বডি পলিটিক্স’-এর অন্যতম পথিকৃৎ।
১৮৮৭ সাল। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস তখন সবেমাত্র হাঁটিহাঁটি পা-পা করছে। রাজনৈতিক নেতারা তখনো আবেদন-নিবেদনের থালায় মগ্ন। ঠিক সেই সময়ে, কলকাতার সিমলা স্ট্রিটের এক যুবক ভাবছিলেন অন্য কথা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন জিমন্যাস্টিকসের পোকা। হিন্দু স্কুলের ছাত্র থাকালে তিনি প্রতিবেশী নবগোপাল মিত্রের আখড়ায় যেতেন। এই নবগোপাল মিত্র ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন—শরীর শক্ত না হলে দেশ স্বাধীন হবে না। তাঁর ‘ন্যাশনাল সার্কাস’-এর অনুপ্রেরণাতেই প্রিয়নাথের মনে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়।
১.১ গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের জন্ম ও দর্শন
প্রিয়নাথ বসু যখন ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’ খুললেন, তখন অনেকেই নাক সিটকেছিলেন। ভদ্রঘরের ছেলে সার্কাস দেখাবে? এ তো বাউণ্ডুলেপনা! কিন্তু প্রিয়নাথের জেদ ছিল অটুট। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, সার্কাস কেবল সাহেবদের কুক্ষিগত বিদ্যা নয়।
প্রিয়নাথের সার্কাসের বিশেষত্ব ছিল এর ‘স্বদেশী’ মেজাজ। তিনি বিদেশ থেকে ট্রেইনার আনতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর দলের প্রধান পারফর্মাররা ছিলেন খাঁটি বাঙালি। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, বাঙালির কব্জির জোর আর শরীরের নমনীয়তা ইউরোপীয়দের চেয়েও উন্নত। তাঁর সার্কাসে কেবল শারীরিক কসরত ছিল না, ছিল অশ্বচালনা (Equestrian), জাগলিং এবং অবশ্যই বাঘের খেলা।
প্রিয়নাথ বসু নিজে ছিলেন একজন দক্ষ শিল্পী। তিনি কেবল সার্কাসের মালিক ছিলেন না, তিনি নিজে রিং-মাস্টারের ভূমিকা পালন করতেন, চাবুক হাতে ঘোড়াদের নাচাতেন, আবার অবসর সময়ে চমৎকার ছবিও আঁকতেন। তাঁর আঁকা ছবি এবং স্কেচগুলো তৎকালীন প্রবাসী পত্রিকায় ছাপা হতো। একজন মানুষ একইসঙ্গে শিল্পী, কুস্তিগীর এবং সংগঠক—এ যেন রেনেসাঁস যুগের কোনো এক চরিত্র।
১.২ বাঙালির প্রথম আন্তর্জাতিক শো
প্রিয়নাথের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবল বাংলার সীমানায় আটকে ছিল না। তিনি তাঁর দলবল নিয়ে সারা ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, জাভা—যেখানে যেখানে তিনি গিয়েছেন, সেখানেই বাঙালির জয়পতাকা উড়িয়েছেন। কল্পনা করুন, আজ থেকে ১৩০ বছর আগে, কোনো স্পন্সর ছাড়া, কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়া, জাহাজে করে হাতি, ঘোড়া, বাঘ এবং শতখানেক মানুষ নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ! এর জন্য যে সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বুকের পাটা লাগে, তা আজকের দিনে বসে কল্পনা করাও কঠিন।
দ্বিতীয় পর্ব: অগ্নিকন্যা সুশীলাসুন্দরী—বাঘের চোখে চোখ রাখা এক বিস্ময়
সার্কাস বা কুস্তির জগতটা ছিল আদ্যোপান্ত পুরুষশাসিত। সেখানে মেয়েদের কাজ ছিল বড়জোর সুন্দর পোশাক পরে দর্শকদের অভিবাদন জানানো বা খুব বেশি হলে দড়ির ওপর হাঁটা। কিন্তু এই ছক ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলেন এক বাঙালি নারী—সুশীলাসুন্দরী।
আজকের ফেমিনিজমের আলোচনায় আমরা অনেক নাম করি, কিন্তু সুশীলাসুন্দরীর নাম সেখানে অনুপস্থিত। অথচ, তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম নারী, যিনি বাঘের খাঁচায় ঢুকে বাঘকে হুকুম করতেন।
২.১ ভাগ্যলক্ষ্মী থেকে গ্রেট বেঙ্গল
সুশীলাসুন্দরীর প্রথম জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। সম্ভবত তিনি কোনো সাধারণ পরিবারের মেয়ে ছিলেন, যাকে সার্কাসের জৌলুস টেনে এনেছিল। প্রথমে তিনি যোগ দেন ‘ভাগ্যলক্ষ্মী সার্কাস’-এ। সেখানে তাঁর সাহস দেখে প্রিয়নাথ বসু তাঁকে নিজের দলে নিয়ে আসেন। প্রিয়নাথ বুঝেছিলেন, এই মেয়ে সাধারণ নয়।
সুশীলা কেবল ট্র্যাপিজের খেলা দেখাতেন না। তাঁর প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের’ সঙ্গে খেলা। ভাবুন তো দৃশ্যটা—পরনে জ্যাকেট আর ব্রিচেস, হাতে সামান্য একটা ছড়ি, আর সামনে খোলা খাঁচায় হিংস্র বাঘ। সুশীলা সেই বাঘের ঘাড়ে হাত রাখতেন, বাঘের মুখ হা করিয়ে তার মধ্যে নিজের মাথা ঢুকিয়ে দিতেন। গ্যালারিতে বসা সাহেব মেমরা ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলত, আর হাততালিতে ফেটে পড়ত তাঁবু। এই দৃশ্য কি কেবল খেলা ছিল? না, এ ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতে এক পরাধীন নারীর অসীম ক্ষমতার আস্ফালন।
২.২ সেই অভিশপ্ত সন্ধ্যা: বাঘ ‘ফরচুন’ ও শেষ লড়াই
সুশীলার জীবনের ট্র্যাজেডিটিও ছিল সিনেমার মতো। ১৯২৪ সালের কথা। তখন তিনি ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস’-এর হয়ে খেলা দেখাচ্ছেন। তাঁর প্রিয় বাঘটির নাম ছিল ‘ফরচুন’। বছরের পর বছর যে বাঘটিকে তিনি নিজের হাতে খাইয়েছেন, সন্তানস্নেহে লালন করেছেন, সেদিন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই ফরচুন বিগড়ে গেল।
খেলার মাঝখানে হঠাৎ বাঘটি গর্জন করে সুশীলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুশীলা ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ। তিনি জানতেন, ভয় পেলেই মৃত্যু নিশ্চিত। তিনি খালি হাতেই বাঘের থাবা রুখতে চেষ্টা করলেন। বাঘের নখ তাঁর শরীরে গেঁথে গেল, কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। রিং-মাস্টার ও অন্যান্যরা ছুটে এসে তাঁকে উদ্ধার করলেন।
রক্তাক্ত সুশীলা বেঁচে ফিরলেন বটে, কিন্তু সেই আঘাত তিনি আর সামলাতে পারেননি। পঙ্গু হয়ে গেলেন চিরতরে। শরীরের ক্ষত হয়তো শুকিয়েছিল, কিন্তু মনের ক্ষত শুকায়নি। চিকিৎসার অভাবে এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে কিছুদিন পরেই এই বীরাঙ্গনার মৃত্যু হয়। বাংলা ভুলে গেল তার প্রথম ‘টাইগার লেডি’কে। আজ তাঁর কোনো সমাধি নেই, কোনো স্মৃতিফলক নেই। আছে কেবল কিছু জীর্ণ সংবাদপত্রের কাটিং।
তৃতীয় পর্ব: শ্যামাকান্ত থেকে সোহং স্বামী—দেহবাদের আধ্যাত্মিক রূপান্তর
বাঙালির সার্কাস ইতিহাসের সবথেকে দার্শনিক এবং বর্ণময় চরিত্র হলেন শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পেশাদার সার্কাস ম্যান ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত সাধক। তাঁর জীবনদর্শন ছিল—"শরীরে শক্তি না থাকলে মনে ভক্তি আসে না।"
ঢাকার বিক্রমপুরের আড়িয়ল গ্রামের এই ছেলেটি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন একগুঁয়ে। পড়াশোনায় মন ছিল না, মন ছিল আখড়ায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাঘ-ভাল্লুককে গায়ের জোরে হারানো সম্ভব।
৩.১ বাঘের সাথে মল্লযুদ্ধ
শ্যামাকান্ত কোনো ট্রেইন্ড বাঘের সাথে খেলতেন না। তিনি জঙ্গল থেকে ধরে আনা বুনো বাঘের খাঁচায় ঢুকে পড়তেন। তাঁর টেকনিক ছিল হাড়-হিম করা। তিনি বাঘের চোয়াল দুহাতে ধরে এমন চাপ দিতেন যে বাঘ যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠত। একে বলা হতো ‘টাইগার রেসলিং’।
ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য একবার শ্যামাকান্তের এই খেলা দেখে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁকে রাজদরবারে বিশেষ সম্মান জানান। শ্যামাকান্তের এই বীরত্ব কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল তৎকালীন যুবসমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। স্বামী বিবেকানন্দ তখন যুবকদের বলছেন, "গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা শ্রেয়।" শ্যামাকান্ত যেন সেই বাণীরই এক জীবন্ত রূপ ছিলেন। তিনি প্রমাণ করছিলেন, দুর্বলতা মহাপাপ।
৩.২ সন্ন্যাস গ্রহণ ও ‘সোহং’ তত্ত্ব
জীবনের মধ্যগগনে এসে শ্যামাকান্তের মনে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য জন্মায়। যে পেশিশক্তি দিয়ে তিনি বাঘকে বশ করেছেন, সেই শক্তি দিয়ে কি মৃত্যুকে বশ করা যায়? এই প্রশ্ন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত। অবশেষে, ৪২ বছর বয়সে তিনি সার্কাসের বর্ণাঢ্য জীবন ত্যাগ করেন। চলে যান হিমালয়ে। গুরুর নির্দেশে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং তাঁর নাম হয় ‘সোহং স্বামী’।
যিনি একসময় বাঘের গর্জন শুনতেন, তিনি এখন শুনতে লাগলেন আত্মার ধ্বনি—"সোহং" (আমিই সেই)। তিনি লিখলেন ‘সোহং গীতা’ ও ‘সোহং সংহিতা’। তাঁর দর্শন ছিল অদ্বৈতবাদ। তিনি বলতেন, "যে বাঘকে আমি কুস্তি লড়ে হারিয়েছি, সেই বাঘ আর আমি ভিন্ন নই। সব একই ব্রহ্মের প্রকাশ।"
শারীরিক শক্তি থেকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে এই উত্তরণ—বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম দেখা যায়। একজন রেসলার হয়ে উঠলেন এক মহান দার্শনিক। তাঁর শেষ জীবন কেটেছিল আলমোড়ার নির্জনে, যেখানে বাঘের বদলে তিনি লড়াই করতেন নিজের মনের রিপুর সঙ্গে।
চতুর্থ পর্ব: সার্কাসের তাঁবু ও বিপ্লবীদের গোপন আঁতাত
বাঙালির সার্কাসের ইতিহাসের সবথেকে রোমাঞ্চকর এবং গোপন অধ্যায় হলো এর সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্পর্ক। এই বিষয়টি নিয়ে খুব একটা গবেষণা হয়নি, কারণ এর প্রমাণগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলায় তখন ‘অনুশীলন সমিতি’ আর ‘যুগান্তর দল’-এর দাপট। বিপ্লবীরা খুঁজছিলেন এমন জায়গা, যেখানে পুলিশি নজরদারি ছাড়াই শারীরিক কসরত, লাঠিখেলা এবং ছোরা খেলা অনুশীলন করা যায়। সার্কাসের তাঁবু হয়ে উঠল সেই আদর্শ আড়াল।
৪.১ অস্ত্র পাচারের নিরাপদ করিডোর
সার্কাসের দলগুলো জিপসিদের মতো এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াত। তাদের সাথে থাকত বিশাল বিশাল কাঠের বাক্স, পশুপাখির খাঁচা এবং তাবু খাটানোর সরঞ্জাম। ব্রিটিশ পুলিশ সাধারণত এই সার্কাসের মালপত্র খুব একটা তল্লাশি করত না। বিপ্লবীরা এই সুযোগটি নিলেন। শোনা যায়, সার্কাসের প্রপস বক্সের মিথ্যা তলায় (False bottom) লুকিয়ে পিস্তল এবং কার্তুজ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পাচার করা হতো।
৪.২ ছদ্মবেশী বিপ্লবী
অনেক বিপ্লবী পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে নাম ও ভেষ বদলে সার্কাসের দলে ভিড়ে যেতেন। তাঁরা সেখানে কসরত দেখাতেন, আর তলে তলে স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করতেন। সার্কাসের জিমন্যাস্টিকস এবং দড়ির খেলা ছিল আসলে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণেরই একটি নামান্তর। শরীরকে নমনীয় করা, উঁচু দেওয়াল টপকানো, নিঃশব্দে চলাফেরা করা—এসবই সার্কাসের মোড়কে শেখানো হতো।
প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে এমন অনেক ‘খেলোয়াড়’ ছিলেন, যারা আসলে ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী। সার্কাস যখন মফস্বলে তাবু গাড়ত, তখন রাতের অন্ধকারে সেখানে বসত গুপ্ত সমিতির গোপন বৈঠক। সার্কাসের ঢাক-ঢোলের আওয়াজে চাপা পড়ে যেত বিপ্লবীদের শলাপরামর্শ।
পঞ্চম পর্ব: বিস্মৃত নক্ষত্ররা এবং পতনের কারণ
শ্যামাকান্ত বা প্রিয়নাথ ছাড়াও আরও অনেক নক্ষত্র ছিলেন, যারা আজ বিস্মৃতির অতলে। যেমন—প্রফেসর কে. সেন। তিনি ছিলেন ট্র্যাপিজের জাদুকর। কিংবা মনা পাইক, যিনি নিজের বুকের ওপর দিয়ে হাতি চালিয়ে দিতে পারতেন। ভুবন গুহ, যিনি দাঁত দিয়ে আস্ত একটা লোহার রড বাঁকিয়ে ফেলতেন।
এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন এক-একজন লৌকিক কিংবদন্তি। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকের পর থেকে বাঙালির এই গর্বের ধন সার্কাস শিল্পে ভাটা পড়তে শুরু করে। কেন?
১. সিনেমার আগ্রাসন: নির্বাক যুগের পর যখন সবাক চলচ্চিত্র এল, মানুষ তাঁবুর গরম আর ধুলো ছেড়ে সিনেমা হলের নরম গদিতে বসতে পছন্দ করতে শুরু করল। সার্কাসের জ্যান্ত রোমাঞ্চের চেয়ে পর্দার মায়া বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠল।
২. খরচ বৃদ্ধি ও বন্যপ্রাণী আইন: বাঘ-সিংহ পোষা এবং তাদের খাওয়ানো ছিল বিশাল খরচের ব্যাপার। পরবর্তীতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোর হওয়ায় সার্কাসের প্রধান আকর্ষণ—পশুখেলা—বন্ধ হয়ে যায়। বাঘহীন সার্কাস অনেকটা লবণের স্বাদ ছাড়া রান্নার মতো হয়ে দাঁড়াল।
৩. বাঙালির রুচি পরিবর্তন: বাঙালি যত বেশি ‘বাবু’ হতে চাইল, তত বেশি সে তার শারীরিক সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে গেল। আখড়ার মাটি মাখা আর সম্মানের কাজ রইল না। মধ্যবিত্ত বাঙালি তার সন্তানকে আর সার্কাসে পাঠাল না, পাঠাল জয়েন্ট এন্ট্রান্সের কোচিং-এ।
উপসংহার: তাঁবুর রশি ছিঁড়ে গেছে কবেই
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘বাঙালির সার্কাস’ শব্দটা শুনলে আমাদের হাসি পায়। আমরা মনে করি, ওটা তো গরিব আর অশিক্ষিত মানুষের বিনোদন। কিন্তু ইতিহাসের আয়নায় তাকালে দেখব, ওই সার্কাসের রিং ছিল আমাদের আত্মসম্মানের যুদ্ধক্ষেত্র।
প্রিয়নাথ বসু বা সুশীলাসুন্দরীরা কেবল খেলা দেখাননি, তাঁরা দেখিয়েছিলেন যে—আমরাও পারি। তাঁরা ব্রিটিশের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "তোমার বন্দুক আছে, কিন্তু আমার আছে কলজে।"
আজকের জিমনেসিয়ামে ট্রেডমিলে দৌড়ানো বাঙালি হয়তো জানেই না, তার পূর্বপুরুষরা একসময় বাঘের সাথে পাঞ্জা লড়ত। সেই ইতিহাস আজ ধুলোয় মিশে গেছে। তাঁবুর রশি ছিঁড়েছে, ক্যানভাসে পোকা ধরেছে, আর আমরা ভুলে গেছি আমাদের সেই পেশিবহুল অতীতকে।
তবুও, কান পাতলে হয়তো এখনো ইতিহাসের কোনো এক জীর্ণ পৃষ্ঠায় শোনা যায় গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের সেই পরিচিত ঘোষণা—
“আসুন! দেখুন! বাঙালির অদম্য সাহস! জ্যান্ত বাঘের সাথে মল্লযুদ্ধ! কেবল আজই! কেবল আজই!”