ভূমিকা: এক লৌকিক বিপ্লবের পদধ্বনি
বাংলার ধর্মীয় এবং সামাজিক ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা প্রায়শই উচ্চবর্ণের বৈদিক বা পৌরাণিক হিন্দুধর্মের দাপট দেখি। কিন্তু এই দাপটের আড়ালে, বাংলার গ্রামীণ জনজীবনের গভীরে এমন একটি ধর্মীয় স্রোত বয়ে চলেছিল যা ছিল সম্পূর্ণভাবে লৌকিক, মানবকেন্দ্রিক এবং দেহবাদী। এই স্রোতটির নাম—নাথধর্ম। নাথধর্ম কেবল একটি ‘ধর্ম’ নয়; এটি ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার এক সামাজিক বিপ্লব, যা বর্ণাশ্রমের কঠোর শৃঙ্খলকে অস্বীকার করে মানুষের শরীর বা ‘পিণ্ড’কেই ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে এক করে দেখেছিল।
আজকের এই প্রবন্ধে আমরা কোনো অলৌকিক কাহিনীর ফাঁদে পা দেব না। আমরা যুক্তিনিষ্ঠ ইতিহাস, সাহিত্য এবং নৃতাত্ত্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে নাথধর্মের উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সংস্কৃতিতে এর গভীর প্রভাবকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। তথাকথিত ‘মূলধারা’র ইতিহাস বইতে যাদের নাম পাদটীকায় থাকে, সেই মৎস্যেন্দ্রনাথ, গোরক্ষনাথ কিংবা হাড়িফার মতো লৌকিক গুরুরাই হবেন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
উদ্ভবের ইতিহাস—বৌদ্ধ ও শৈবধারার সঙ্গম
নাথধর্মের উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, ঐতিহাসিক সত্য হলো—এটি কোনো আকাশ থেকে পড়া ধর্মমত নয়। পাল যুগের শেষ দিকে এবং সেন যুগের শুরুতে, যখন বাংলায় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করেছে এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থান ঘটছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে নাথধর্মের জন্ম।
বাংলার মাটিতে তখন ‘সহজিয়া’ বৌদ্ধমত প্রচলিত ছিল। এই সহজিয়া বৌদ্ধরা বিশ্বাস করতেন যে নির্বাণ লাভের জন্য কঠোর তপস্যা বা পুঁথিগত বিদ্যার প্রয়োজন নেই, বরং মানুষের সহজ প্রবৃত্তির মাধ্যমেই মহাসুখ লাভ সম্ভব। এই বৌদ্ধ তান্ত্রিকতার সঙ্গে যখন শৈব দর্শনের মিলন ঘটল, তখনই জন্ম নিল নাথপন্থা।
সহজ কথায়, নাথধর্ম হলো তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের কায়াসাধনা এবং শৈব দর্শনের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এখানে ‘নাথ’ শব্দের অর্থ ‘প্রভু’ বা ‘রক্ষাকর্তা’। এই সম্প্রদায়ের আদি গুরু হিসেবে ধরা হয় স্বয়ং শিবকে, যাঁকে তাঁরা বলেন ‘আদিনাথ’। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নাথদের শিব পৌরাণিক কৈলাশবাসী দেবতা নন; তিনি হলেন মহাজ্ঞানের প্রতীক, এক বিমূর্ত সত্তা।
ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় বা শশিভূষণ দাশগুপ্তের মতো গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, নাথগুরুরা আসলে ছিলেন সমাজের তথাকথিত ‘নিচুতলার’ মানুষ। তাঁরা সংস্কৃত মন্ত্র আউড়ে পূজা করতেন না, বরং লোকভাষায় গান গেয়ে তত্ত্বকথা প্রচার করতেন। এই কারণেই নাথধর্ম খুব দ্রুত বাংলার সাধারণ কৃষক, তাঁতি এবং শ্রমজীবী মানুষের ধর্মে পরিণত হয়েছিল।
কায়াসাধনা—দেহ যখন ব্রহ্মাণ্ড
নাথধর্মের মূল দর্শনটি অত্যন্ত চমৎকার এবং বিজ্ঞানমনস্ক (তৎকালীন প্রেক্ষাপটে)। তাঁরা বলতেন, “যেটা নেই ভাণ্ডে, সেটা নেই ব্রহ্মাণ্ডে।” অর্থাৎ, এই মানবদেহের মধ্যেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে।
নাথ যোগীরা বিশ্বাস করতেন, আমাদের শরীর অপরিণত বা ‘অপক্ক’। সাধারণ মানুষের শরীর রোগ, জরা এবং মৃত্যু দ্বারা আক্রান্ত হয়। কিন্তু বিশেষ যোগসাধনার মাধ্যমে এই অপক্ক দেহকে ‘পক্ক’ বা অবিনশ্বর দেহে রূপান্তর করা সম্ভব। একেই তাঁরা বলতেন ‘কায়াসাধনা’।
এই সাধনার মূলে ছিল—সূর্য ও চন্দ্রের ধারণা। নাথ দর্শন অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্কের সহস্রার চক্রে থাকে ‘চন্দ্র’, যা থেকে ক্ষরিত হয় অমৃত বা সোমরস। আর নাভিমূলে থাকে ‘সূর্য’ বা কালাগ্নি। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই অমৃত ঝরে পড়ে সূর্যের আগুনে ভস্ম হয়ে যায়, তাই মানুষ বুড়িয়ে যায় ও মারা যায়। হঠযোগের মাধ্যমে নাথরা এই অমৃতের ক্ষরণ রোধ করে তাকে উল্টোপথে চালিত করার চেষ্টা করতেন। একেই বলা হয় ‘উল্টো-সাধনা’।
এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, নাথরা কোনো কাল্পনিক স্বর্গের কথা বলেননি। তাঁদের মোক্ষ বা মুক্তি ছিল এই শরীরেই—জীবদ্দশায় অমরত্ব লাভ বা ‘জীবন্মুক্ত’ অবস্থা। এটি সেই সময়ের জন্য ছিল এক বৈপ্লবিক চিন্তাধারা, যেখানে পরকাল নয়, বরং ইহকাল এবং এই রক্তমাংসের শরীরই মুখ্য।
নাথগুরুদের উপাখ্যান—মৎস্যেন্দ্রনাথ ও গোরক্ষনাথ
নাথধর্মের ইতিহাসে যে দুজন মানুষের নাম সবথেকে উজ্জ্বল, তাঁরা হলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ (বা মীননাথ) এবং তাঁর শিষ্য গোরক্ষনাথ। ঐতিহাসিকদের মতে, মৎস্যেন্দ্রনাথ সম্ভবত দশম শতাব্দীর মানুষ ছিলেন এবং তাঁর জন্মস্থান ছিল বঙ্গদেশেরই কোনো এক সাগর-উপকূলবর্তী এলাকায় (অনেকে চন্দ্রদ্বীপ বা সন্দীপের কথা বলেন)।
মৎস্যেন্দ্রনাথের পতন ও উদ্ধার:
নাথ সাহিত্যে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কাহিনী আছে—‘গোরক্ষবিজয়’। কাহিনীতে দেখা যায়, মহাজ্ঞানী মৎস্যেন্দ্রনাথ কদলী রাজ্যে গিয়ে নারীদের সংস্পর্শে এসে নিজের যোগশক্তি হারিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে পড়েন। তিনি ভুলে যান তাঁর সাধনার কথা। তখন তাঁর শিষ্য গোরক্ষনাথ ছদ্মবেশে সেখানে যান এবং গুরুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে ধাঁধার মাধ্যমে গান গান। এই গানগুলোই লৌকিক সাহিত্যে অমর হয়ে আছে।
এই কাহিনীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, একসময় নাথধর্ম তান্ত্রিক বামাচার বা নারী-সংসর্গের দিকে ঝুঁকেছিল (বৌদ্ধ সহজিয়া প্রভাব), কিন্তু গোরক্ষনাথ এসে সেই ধারাকে সংস্কার করেন এবং কঠোর ব্রহ্মচর্য ও হঠযোগের প্রবর্তন করেন। গোরক্ষনাথ ছিলেন নাথধর্মের প্রকৃত সংগঠক। তিনি সারা ভারত ভ্রমণ করে এই মতবাদ প্রচার করেছিলেন, যার প্রমাণ আজও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ‘গোরক্ষপুর’ বা ‘গোরখনাথ মঠ’ হিসেবে টিকে আছে।
নাথ সাহিত্য—বাংলার আদিমতম কণ্ঠস্বর
চর্যাপদের পরেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নাথ সাহিত্যের স্থান। কিন্তু চর্যাপদ ছিল কিছুটা সাংকেতিক ভাষার (সন্ধ্যা ভাষা), যা সাধারণের বোঝা কঠিন ছিল। বিপরীতে, নাথ সাহিত্য রচিত হয়েছিল একদম খাঁটি লৌকিক বাংলায়।
নাথ সাহিত্যের প্রধান দুটি ধারা:
১. গোরক্ষবিজয় বা মীনচেতন: গোরক্ষনাথ কর্তৃক গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথকে উদ্ধারের কাহিনী।
২. ময়নামতীর গান বা গোপীচন্দ্রের গান: এটি বাংলার লোকসাহিত্যের এক অমূল্য রত্ন।
ময়নামতী ও গোপীচন্দ্রের উপাখ্যান:
এই কাহিনীটি কুমিল্লা ও উত্তরবঙ্গের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রানী ময়নামতী ছিলেন এক মহাজ্ঞানী ডাকিনী বা যোগিনী (যিনি সম্ভবত গোরক্ষনাথের সমসাময়িক বা শিষ্যা)। তিনি জানতেন যে তাঁর পুত্র রাজা গোপীচন্দ্রের আয়ু স্বল্প। যমদুত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে তিনি গোপীচন্দ্রকে জোর করে সন্ন্যাস গ্রহণ করতে বাধ্য করেন। রাজা গোপীচন্দ্র, যিনি ছিলেন ভোগবিলাসী, মায়ের আদেশে রাজ্যপাট ছেড়ে হাড়িফা নামক এক নাথগুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং অশেষ দুঃখকষ্ট সহ্য করে অবশেষে অমরত্ব লাভ করেন।
এই গানগুলো বাংলার গ্রাম-গঞ্জে আজও ‘যোগী’ বা ‘যুগী’ সম্প্রদায়ের মানুষেরা গেয়ে শোনান। এই সাহিত্যে আমরা দেখি নারীর এক প্রবল ক্ষমতায়ন। রানী ময়নামতী এখানে কোনো অবলা নারী নন, বরং তিনি রাজাকেও শাসন করার ক্ষমতা রাখেন এবং অলৌকিক জ্ঞানের অধিকারী। এটি তৎকালীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজ বা নারীশক্তির এক লৌকিক রূপক হতে পারে।
পঞ্চম অধ্যায়: সামাজিক প্রেক্ষাপট—ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে সংঘাত
নাথধর্ম কেন হারিয়ে গেল বা কোণঠাসা হয়ে পড়ল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক ইতিহাসে। সেন যুগে যখন কৌলিন্য প্রথা এবং কঠোর বর্ণবাদ চালু হলো, তখন নাথরা ছিলেন এর প্রধান বিরোধী। নাথরা বেদ মানতেন না, ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের তোয়াক্কা করতেন না এবং জাতিভেদের ধার ধারতেন না।
ফলে, স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন বা অন্যান্য স্মার্ত পণ্ডিতরা নাথদের বা ‘যোগী’দের অস্পৃশ্য বা জল-অচল শূদ্র বলে ঘোষণা করলেন। সামাজিকভাবে তাঁদের একঘরে করে দেওয়া হলো। একসময় যারা ছিলেন সমাজের শ্রদ্ধেয় গুরু, তাঁরা হয়ে গেলেন প্রান্তিক ‘যুগী’ জাতি—যাদের কাজ হলো তাঁত বোনা বা ভিক্ষা করা।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ইসলামের আগমনের পর এই চিত্রটা কিছুটা পাল্টে গেল। সুফি দরবেশদের সঙ্গে নাথ যোগীদের এক অপূর্ব সখ্যতা গড়ে উঠল। সুফিদের ‘ফানা’ হওয়ার ধারণা আর নাথদের ‘জীবন্মুক্ত’ হওয়ার ধারণার মধ্যে অনেক মিল ছিল। ফলে মধ্যযুগে আমরা দেখি ‘সত্য পীর’ বা নানা লৌকিক পীর-ফকিরের উদ্ভব, যাঁদের অনুসারী হিন্দু-মুসলিম উভয়েই। অনেক নাথ যোগী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘ফকির’ বা ‘দরবেশ’ নামে পরিচিত হলেন, কিন্তু তাঁদের সাধনার পদ্ধতি সেই হঠযোগই রয়ে গেল।
ষষ্ঠ অধ্যায়: নাথধর্মের বর্তমান ও উত্তররাধিকার
আজকের আধুনিক বাংলায় নাথধর্ম কোনো সংগঠিত ধর্ম হিসেবে হয়তো নেই, কিন্তু এটি মিশে আছে আমাদের রক্তে, আমাদের লৌকিক আচারে। উত্তরবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আজও ‘নাথ’ উপাধির প্রচুর মানুষ বাস করেন। তাঁরা আজ হিন্দু সমাজেরই অংশ, কিন্তু তাঁদের গোত্র পরিচয় (শিব গোত্র) এবং শবদাহের বদলে সমাধি (মাটি দেওয়া) দেওয়ার প্রথা আজও তাঁদের প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
বাউল, ফকির এবং সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্মের যে প্রবল বিস্তার বাংলায় ঘটেছিল পরবর্তীকালে, তার জমি তৈরি করে দিয়েছিল এই নাথধর্মই। লালন সাঁইজির গানে যে ‘দেহতত্ত্ব’ আমরা পাই (“খাঁচার ভিতর অচিন পাখি”), তার আদি উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের সেই চর্যাপদ আর নাথ গীতিকার কাছেই ফিরে যেতে হয়।
উপসংহার: শেকড়ের সন্ধানে
নাথধর্মকে কেবল একটি ‘সেক্ট’ বা সম্প্রদায় ভাবলে ভুল হবে। এটি ছিল বাংলার মানুষের নিজস্ব ধর্ম—যা মাটি থেকে উঠে এসেছিল। এটি শিখিয়েছিল যে ঈশ্বর কোনো মন্দিরে বা আকাশে নেই, তিনি আছেন এই শরীরের ভেতরেই।
ইতিহাস কোনো মরা মানুষের গল্প নয়, ইতিহাস হলো আমাদের বর্তমানের ভিত্তি। নাথধর্মের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, একসময় বাঙালি জাতিভেদ আর পুঁথিগত কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এবং মানুষের শরীরকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছিল। গোরক্ষনাথ বা ময়নামতীর কাহিনী কোনো রূপকথা নয়; এগুলি হলো বাংলার লৌকিক রেনেসাঁসের এক একটি দলিল। আজ যখন আমরা ধর্ম নিয়ে উন্মাদনায় মেতে উঠি, তখন এই বিস্মৃত যোগীদের দর্শন আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিতে পারে—সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।