১৮৫০-এর টিপরা বিদ্রোহ: অস্তিত্বের সেই অমোঘ গর্জন
ইতিহাসের গতিপথ কোনো সরলরেখায় চলে না। এটি আসলে এক ঘাত-প্রতিঘাতের খেলা, যেখানে শাসক আর শাসিতের লড়াই সভ্যতার চাকাটিকে বারবার নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেয়। আমরা যখন ত্রিপুরার ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখন উজ্জ্বল রাজপ্রাসাদের ছায়ার নিচে এক নীরব যন্ত্রণার ইতিহাসও খুঁজে পাই। মানুষ বিদ্রোহ কেন করে? মানুষ কি শুধুই ব্যক্তিগত ক্ষমতার জন্য অস্ত্র ধরে? না। বিদ্রোহ তখনই অনিবার্য হয়ে ওঠে, যখন অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসে। যখন একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তাটুকুও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যায়। আজ আমরা আলোচনা করব ত্রিপুরার ইতিহাসের এমনই এক অমোঘ সন্ধিক্ষণ নিয়ে—১৮৫০ সালের টিপরা বিদ্রোহ।
প্রেক্ষাপট: যখন শোষণ শিল্পের রূপ নেয়
১৮৫০ সাল। ত্রিপুরার সিংহাসনে তখন মহারাজ কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্য। বাইরে থেকে রাজকীয় জাঁকজমক থাকলেও ভেতরে ভেতরে রাজপ্রশাসন তখন দুর্নীতির ঘুণে জরাজীর্ণ। প্রজাদের ওপর করের বোঝা তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাকে শাসন না বলে শোষণ বলাই সঙ্গত। তৎকালীন রাজকর্মচারী বা 'সংগৃহীত' কর্মকর্তারা নিজেদের পকেট ভরার নেশায় জুম চাষিদের ওপর অমানবিক সব কর চাপাতে শুরু করেন। জুম চাষের ওপর অতিরিক্ত কর এবং রাজকর্মচারীদের খামখেয়ালি হুকুম—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের পিঠ তখন দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছিল।
নেতৃত্বে কীর্তি ও রূপবতী
এই বিদ্রোহের সবথেকে শক্তিশালী দিক হলো এর নেতৃত্ব। বিদ্রোহের ইতিহাসে আমরা প্রায়ই পুরুষের আস্ফালন দেখি, কিন্তু ১৮৫০-এর এই বিদ্রোহ আমাদের এক অনন্য নারীর কথা মনে করিয়ে দেয়—রূপবতী। মাঝে মাঝে মনে হয়, শক্তির মধ্যে এমন কিছু বিষ আছে যা তাকে দাম্ভিক করে তোলে, কিন্তু সেই দম্ভকে চূর্ণ করতে যখন রূপবতীর মতো সাধারণ কোনো গৃহবধূ রণচণ্ডী হয়ে ওঠেন, তখনই প্রকৃত বিপ্লব ঘটে। কীর্তি এবং রূপবতী দুজনে মিলে টিপরা জনজাতিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, দাসত্ব কোনো ভবিতব্য নয়, বরং মুক্তির পথ আমাদের নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হয়।
বিদ্রোহের আগুন ও দমনের অধ্যায়
খোয়াই অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। বিদ্রোহীরা সরকারি শস্যভাণ্ডার লুঠ করে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। এটি ছিল এক অদ্ভুত দৃশ্য—একদিকে রাজকীয় ক্ষমতা আর অন্যদিকে মানুষের বাঁচার আকুতি। কিন্তু আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র আর ব্রিটিশ সহায়তার সামনে বিদ্রোহীদের বাঁশের তীর খুব বেশিদিন টিকতে পারল না। কীর্তি এবং রূপবতীকে বন্দি করা হলো। বিদ্রোহীকে মারা যায়, কিন্তু বিদ্রোহের চেতনাকে কি মারা যায়?
উপসংহার: অস্তিত্বের জয়গান
আজকের ত্রিপুরার যে বৈচিত্র্যময় জনজীবন, তার মূলে রয়েছে এই সব অসংখ্য ছোট-বড় বিদ্রোহের ইতিহাস। কীর্তি এবং রূপবতীর এই আত্মত্যাগ আমাদের সেই শিকড়েরই কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বিদ্রোহ আমাদের শিখিয়ে গেছে যে, পৃথিবীর কোনো শাসনই মানুষের চেতনার চেয়ে বড়ো নয় । যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন কোনো না কোনো রূপে বিদ্রোহ ফিরে ফিরে আসবেই।