১৮৬৩ সালের জমাতিয়া বিদ্রোহ: যখন বীরের ইজ্জতে টান পড়ল!

১৮৬৩-র জমাতিয়া বিদ্রোহ: ইজ্জত বনাম রাজদণ্ড

যখন তলোয়ার ছেড়ে জপের মালা ধরল এক যোদ্ধা জাতি

তিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, ত্রিপুরার পাহাড়ি জনপদ জমাতিয়াদের বীরত্ব নিয়ে কথা বলা আর বাঘের ডেরায় ঢুকে মাংস চাওয়া—দুটোই সমান সাহসের কাজ। ত্রিপুরার মাণিক্য রাজাদের আমলে এই জমাতিয়া সম্প্রদায় কেবল প্রজা ছিল না, তারা ছিল রাজ্যের জীবন্ত প্রাচীর। রাজারা তাদের ওপর এতটাই ভরসা করতেন যে, তাদের খাজনা দেওয়ার বদলে রক্ত দেওয়ার চুক্তি ছিল। সোজা কথায়, চাষবাসের পয়সা না দিলেও চলবে, কিন্তু যুদ্ধের ডঙ্কা বাজলে তলোয়ার হাতে সবার আগে সীমান্তে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ব্যস, এই ছিল জমাতিয়াদের সঙ্গে রাজবাড়ির অলিখিত চুক্তি।

কিন্তু ১৮৬৩ সালে গণ্ডগোলটা খাজনা নিয়ে বাঁধল না, বাঁধল ‘আত্মসম্মান’ নিয়ে। সেই হাঙ্গামার গল্পটা যেমন নাটকীয়, তেমনি শিহরণ জাগানিয়া।

ওখিরাই হাজারির এক খামখেয়ালি হুকুম

বিদ্রোহের আগুনটা জ্বলেছিল জনৈক ওখিরাই (বা অখিরাই) হাজারির হাত ধরে। লোকটা রাজকর্মচারী বটে, কিন্তু মেজাজটা ছিল আসমানছোঁয়া। তখনকার দিনে রাজকর্মচারীরা পাহাড়ে ভ্রমণে বেরোলে তাঁদের মালপত্র বওয়ানোর জন্য পাহাড়িদের ওপর হুকুম জারি করতেন। একে বলা হতো ‘কুলি’ খাটানো।

"ওখিরাই হাজারি হুকুম দিলেন, জমাতিয়া জোয়ানেরা তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বাঁশের দোলনায় করে কাঁধে নিয়ে পাহাড় ডিঙিয়ে পৌঁছে দেবে। আর এটাই ছিল জমাতিয়াদের বারুদে দেশলাই ঘষার নামান্তর।"

যারা নিজেদের রাজার সিপাই মনে করে, যারা যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর কল্লা নামাতে ওস্তাদ, তারা কি শেষে এক আমলার বউয়ের পালকি বইবে? জমাতিয়াদের পুরুষত্ব আর আভিজাত্যে চরম আঘাত লাগল। তারা সটান জানিয়ে দিল—হবে না, কক্ষনো না!

পরীক্ষিৎ জমাতিয়া: পাহাড়ের নতুন নেতা

বিদ্রোহ যখন ছড়িয়ে পড়ছে, তখন তার রাশ ধরলেন এক আশ্চর্য মানুষ—পরীক্ষিৎ জমাতিয়া। সোনামুড়ার বেজমনি গ্রামের এই যুবকের ব্যক্তিত্ব ছিল পাহাড়ের মতোই অটল। লোকমুখে শোনা যেত, তাঁর নাকি বিশেষ কোনো দৈব শক্তি আছে। পরীক্ষিৎ যখন ডাক দিলেন, তখন থরোথরো করে কেঁপে উঠল পাহাড়ের বুক। তিনি শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, ছিলেন এক অমোঘ নেতা।

পরীক্ষিৎ ঘোষণা করলেন, “আমরা রাজার প্রজা, গোলাম নই। কোনো অন্যায্য কুলি খাটব না, খাজনাও দেব না।” তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার জমাতিয়া তীর-ধনুক নিয়ে এককাট্টা হয়ে গেল। খোয়াই থেকে উদয়পুর—পুরো অঞ্চল তখন রাজার শাসনের বদলে পরীক্ষিৎ জমাতিয়ার হুকুমে চলতে শুরু করল।

⬥ ⬥ ⬥

বীরচন্দ্র মাণিক্য ও কুকি বাহিনীর অভিযান

তৎকালীন মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য দেখলেন অবস্থা বেগতিক। ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বীরচন্দ্র ছিলেন ধুরন্ধর এবং আধুনিক মানুষ। তিনি জানতেন, এই বীর জমাতিয়াদের শুধু বন্দুক দিয়ে দমানো যাবে না। তাই তিনি এক মোক্ষম চাল চাললেন—তিনি ডেকে পাঠালেন দুর্ধর্ষ কুকি বাহিনীকে।

১৮৬৩ সালের সেই যুদ্ধ ছিল অসম লড়াই। একদিকে জমাতিয়াদের অদম্য সাহস আর বাঁশের তীর, অন্যদিকে রাজকীয় বাহিনীর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। পাহাড়ের গায়ে বারুদের ধোঁয়া উড়ল, প্রায় শ-দুয়েক জমাতিয়া বীর সেই অসম যুদ্ধে প্রাণ দিলেন। যুদ্ধের শেষে জমাতিয়ারা পিছু হটতে বাধ্য হলো এবং এক সময় ধরা পড়লেন পাহাড়ের সেই অবিসংবাদিত নায়ক পরীক্ষিৎ জমাতিয়া।

রাজদরবারের সেই ঐতিহাসিক বিচার

পরীক্ষিৎ যখন বন্দি অবস্থায় আগরতলার রাজদরবারে হাজির হলেন, উপস্থিত সবাই ভেবেছিল আজ বুঝি এই অবাধ্য বীরের মাথাটা ধড় থেকে আলাদা হবে। কিন্তু বীরচন্দ্র মাণিক্য ছিলেন জহুরি। তিনি লোক চিনতে ভুল করেননি। দরবারে দাঁড়িয়ে পরীক্ষিৎ যখন নির্ভীকভাবে রাজকর্মচারীদের দুর্নীতি আর ওখিরাই হাজারির সেই অপমানের কথা রাজার সামনে তুলে ধরলেন, তখন মহারাজ মুগ্ধ হলেন।

রাজা বুঝলেন, এই বিদ্রোহ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার লড়াই। বীরচন্দ্র মাণিক্য পরীক্ষিৎকে ফাঁসি তো দিলেনই না, বরং তাঁর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন এবং জমাতিয়াদের সমাজপতি বা ‘আকরা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। তবে একটা শর্ত থাকল—সবাইকে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে শান্তির পথে ফিরতে হবে।

উপসংহার: আধুনিক ত্রিপুরার পথে

এই বিদ্রোহ থেকেই ত্রিপুরার রাজতন্ত্র বুঝতে পেরেছিল যে, শুধু দণ্ড দিয়ে মানুষ শাসন করা যায় না। এর ফলস্বরূপই পরবর্তীকালে ত্রিপুরার প্রশাসন আধুনিক হতে শুরু করে এবং দাসপ্রথার মতো কুপ্রথাগুলো চিরতরে বিদায় নেয়। ১৮৬৩ সালের সেই হাঙ্গামা তাই কেবল একটা যুদ্ধ ছিল না, ছিল আধুনিক ত্রিপুরার পত্তনের এক শক্তিশালী সোপান।

X

Never Miss an Update!

Join my newsletter to get the latest posts from AbhijitDas.in directly to your inbox.